শ্রদ্ধাঞ্জলি

'তোমার আঁচল ঝলে আকাশতলে রৌদ্রবসনী'

প্রকাশ : ২০ জুন ২০১৬, ১৪:১৫

কবি সুফিয়া কামাল, সবাই ডাকেন সুফিয়া খালাম্মা। মাতৃস্বরূপ এই মহান মানুষকে আমি তিনভাবে দেখেছি। প্রথম দেখেছিলাম দূর থেকে, দ্বিতীয়বার সামনাসামনি আর তৃতীয় দেখা অন্তরে, অনুভবে—যিনি মাতৃসম, বাংলাদেশের আকাশে যাঁর স্নেহের আঁচল ছায়া দিয়ে রেখেছে সব সন্তানকে।

১. দূর থেকে দেখা রৌদ্রবসনী
বছরটি ১৯৮৯। শীতের কোনো বিকেল। সেবার ডাকসু নির্বাচনে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ডাকসু এবং হল সংসদগুলোতে বিপুল ভোটে জয়ী হয়। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এই নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছিল। নতুন নির্বাচিত ডাকসু এবং হল সংসদের অভিষেকের দিন ছিল সেটি। রোদে উজ্জ্বল কানায় কানায় পূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ডাকসুর সভাপতি উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নান মঞ্চে উঠতেই মঞ্চের আশপাশে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা তাকে কালো পতাকা দেখানো শুরু করেন। এই অপ্রত্যাশিত আচরণের জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। এমন পরিস্থিতিতে প্রধান অতিথি সুফিয়া কামাল বললেন মাইক্রোফোনে শান্ত-মৃদু গলায়, অনুষ্ঠানের ক্রোড়পত্রের পেছন পাতার সাদা দিকটা দেখাতে। নিজেও তুলে ধরলেন সেই সাদা পাতা। মুহূর্তেই কালো পতাকা ছাপিয়ে হাজারো ছাত্রছাত্রী ক্রোড়পত্রের সাদা পাতাটি তুলে ধরলেন। কালো পতাকা পর্যুদস্ত হলো, কবুতর উড়ল আকাশে, উৎসবের রঙিন বেলুন ছড়িয়ে পড়ল, শুরু হলো জাতীয় সংগীত। সেই অনুষ্ঠান তারপর প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত চলেছিল। আমার চোখে সাদা শাড়ির উজ্জ্বলতায় মৃদু মায়ের অবভাস আজও রৌদ্রবসনী।

২. ক্ষুধার্ত সন্তান লাগি কোমল মাটির মা
১৯৯০ সালে আবার ডাকসু নির্বাচন হলো। এবার সংগ্রাম পরিষদ ঐক্যবদ্ধ প্যানেল দিতে পারল না। ছাত্রদল বিজয়ী হলেও হল সংসদের দু-একটি পদে বিচ্ছিন্নভাবে ছাত্রদলের বাইরেও কেউ কেউ জেতেন। আমি শামসুন নাহার হল সংসদের সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হলাম। অভিষেক-সংকলন প্রকাশের দায় ন্যস্ত হওয়ায় সাহস করে একদিন কবির কাছে ফোন করে একটি কবিতা চেয়ে বসলাম। তিনি বললেন, ‘আমি তো আধুনিক কবিতা লিখি না, তোমাদের কি পছন্দ হবে?’ পরদিন ‘সাঁঝের মায়া’য় গিয়ে কবিতাটি নিয়ে আসতে বললেন। সাঁঝের মায়ায় যখন গেলাম, তখনো সকাল। বারান্দার রোদে সবজি কাটছিলেন নিজ হাতে। পরিচয় দিতে স্নেহের সঙ্গে বসতে দিলেন। নিয়ে এলেন ছোট কাচের বাটিতে চিড়ের মোয়া, নাড়ু আর এক গ্লাস ঠান্ডা জল। নিয়ে এলেন ‘কন্যারা’ নামে একটি কবিতা। পড়ে শোনালেন মৃদুস্বরে। কবিতাটি ছাপা হলো হলের অভিষেক সংকলন পোড়া করোটিতে ফুলের সমারোহ-তে। কবিতাটি আমার জানামতে, কোনো সংকলনভুক্ত নয় আজও, তাই তুলে দিচ্ছি এখানে:

ধান কন্যারা জাগে বক্ষভরি মমতার ক্ষীর
ক্ষুধার্ত সন্তান লাগি কোমল মাটির
ফসলের ভার
নিত্যই দিতেছে উপহার।
নিত্যই দিতেছে রূপ, ছন্দ, গন্ধ গান
নয়ন জুড়ানো, তৃপ্তি লভে যাতে প্রাণ।
উদার সানন্দ চিত্ত যাতে হয় মানব সন্তান
ধৈর্যে, সাহসের বীর্যে মানব মহান
নিত্যকার হানাহানি কুটিল বিদ্বেষ
যেনো হয় শেষ।
শািন্তর কপোত দিক ডানা মেলে তার
ঘুচুক অজ্ঞান অন্ধকার
ধান কন্যারা দিক ফসলের ভার
নিত্য উপহার
ক্ষুধার্ত লভুক তৃপ্তি, শািন্তর কপোত দিকে দিকে
প্রসন্ন অনন্দ বার্তা যাক লিখে লিখে।
এক অনির্বচনীয় আনন্দ বুকে নিয়ে ফিরে এলাম জননী-হাতের মোয়া-নাড়ু আস্বাদন আর কবিতা নিয়ে। ক্ষুধার্ত সন্তান লাগি কোমল মাটির মা-কে বুকে নিয়ে ফিরে এল তাঁর কন্যা।

৩. নিরন্তর দেখা অনুভবের
কবি সুফিয়া কামালের কবিতার সঙ্গে হাতেখড়ি সেই শৈশবেই। ‘নুরু-পুষি-আয়েশা-শফি সবাই এসেছে’ থেকে ‘আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা/ তোমাদের যুগে সেই বয়সে লেখা-পড়া করো মেলা’ হয়ে ‘বহুদিন পরে মনে পড়ে আজি পল্লী মায়ের কোল’। তিন কবিতার ছবিই গেঁথে আছে। সহজ বাক্যে আঁকা মায়াবী ছবি। কলেজে পড়েছি ‘সাঁঝের মায়া’—যেখানে ‘মুক্তি লভে বন্দী আত্মা-সুন্দরের স্বপ্নে, আয়োজনে,/ নিঃশ্বাস নিঃশেষ হোক পুষ্প বিকাশের প্রয়োজনে’। তখনো বুঝিনি সবটা। তবে দূরে-কাছে দুবার দেখা হওয়ার পরে বুঝেছি, ‘নিঃশ্বাস নিঃশেষ হোক পুষ্প বিকাশের প্রয়োজনে’—এই ছিল তাঁর কাব্য-সাধনা আর জীবন-সাধনার মর্মবাণী।

আর তাই কবির মৃদুতার গণ্ডি ছেড়ে তাঁকে দেখি সমাজসংস্কারক হিসেবে, নারীমুক্তি আন্দোলনের পুরোধা হিসেবে, মহিলা পরিষদের প্রধান দায়িত্বে। আমাদের নারী জাগরণের দুই পথিকৃৎ বেগম রোকেয়া ও সুফিয়া কামাল দুজনেরই দুটি সত্তা সমান্তরালভাবে প্রবহমান। একটি সৃজনশীল, অন্যটি সমাজসংস্কারক সত্তা। বেগম রোকেয়া সমাজসংস্কারক হিসেবে যে কথা প্রকাশ্যে বলতে পারেননি, সে কথাই বলেছেন তাঁর উপন্যাসের নারী চরিত্রের মধ্য দিয়ে। বিশেষত পদ্মরাগের বয়ানে। সুফিয়া কামাল আমূল রোমান্টিক কবি অথচ তাঁর সমাজসংস্কারক ভূমিকা নারীমুক্তিকে রাজনীতিসংলগ্নতা দিয়েছে। আমি দেখি এটি বাংলার নারীমুক্তির আন্দোলনের দ্বিতীয় স্রোত হিসেবে। তিনি বলেছেন, ‘নারীর অধিকার, গণতন্ত্র ও বিশ্বশািন্তর সংগ্রাম এক ও অবিচ্ছেদ্য’। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের পরে নারীর মুক্তিকে রাজনীতি, এমনকি বিশ্বরাজনীতির সঙ্গে একাকার করে দেখেছেন প্রথম সুফিয়া কামাল। আজকের নারীবাদী আন্দোলন তাত্ত্বিকভাবে এগোলেও রাজনীতির সঙ্গে, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সঙ্গে তাদের আকাঙ্ক্ষা মেলাতে পারেনি বলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসছে না। নারীর আন্দোলন অনেকটাই বি-রাজনীতিক করপোরেট পুঁজির বৃত্তে আটকে পড়েছে। তিনি এমনকি তাঁর কবিতাকেও রাজনীতির বাইরে রাখেননি, ‘যত দিন পর্যন্ত রাজনীতি বলতে মানবতাবোধের পুনরাধিষ্ঠান, সমতার অধিকার, মানুষের ভালো থাকা এবং ব্যক্তিগত ও সমাজজীবনের ওপর তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের কথা বোঝায়, আমার কবিতা আর রাজনীতি একসূত্রে গাঁথা’।

সুফিয়া কামালকে বুঝতে তাঁর কবিতার পুনর্পাঠ জরুরি। পৃথিবীর সব সংস্কৃতিতে যেমন, আমাদের সংস্কৃতিতেও সুফিয়া কামাল একজন কবি এবং একই সঙ্গে একজন নারীও বটে। জীবনবোধ আরোপিত না হলে, তাঁর অভিজ্ঞতার অকপট প্রকাশ থাকাই দস্তুর। অথচ পুরুষ বিচারকাঠামো না বুঝেই নারী পরিমণ্ডলের উপস্থাপনকে হেয়জ্ঞান করে আর আমরা এই লিঙ্গ রাজনীতির শিকার হই। ঘরের যে জগৎ, সেই জগতের হদিস না জানা সামগ্রিক পুরুষ পরিমণ্ডলের সাহিত্যচিন্তা এবং বিচারকাঠামো যে কত সীমাবদ্ধ, সে কথা সাহস করে কেইবা বলতে পেরেছে কবে! ফরাসি নারীবাদী তাত্ত্বিক এলেন সিকোঁ, নিজের অভিজ্ঞতার প্রকাশকে নারীর সৃজনশীল সত্তার মুক্তির সূত্র হিসেবে দেখছেন। সুফিয়া কামালের কবিতায় নারী তার নারীশক্তিতে উজ্জ্বল, নারীশক্তির কাছেই তার আহ্বান। তার জীবন, সংগ্রাম এবং সৃজনশীলতা তাই এক অখণ্ড প্রয়াস। তিনি ‘আলোর দুহিতা’, ‘সেই পুরাতন আলেফ লায়লা’, ‘জেব-উন-নিসা’, ‘অঙ্গনার অন্য নাম’, ‘অনন্যা’, ‘নারী ও ধরিত্রী’ কিংবা ‘অমৃত কন্যা’র শরণ নেন বারবার, তুলে আনেন ।

যেকোনো অনটন-অশুভ-অন্ধকার শক্তির বিপরীতে, এ অঞ্চলে মায়েদের রুখে দাঁড়ানোর যে সংস্কৃতি প্রবহমান, সেই শক্তির বিপরীতে তিনি কখনোই যাননি—জীবনে কিংবা সাহিত্যে। তাঁর আঁচলটি তাই বরাভয় হয়ে ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশের আকাশে।

অন্ধকারের বিপরীতে সাদা শান্তির পতাকা কিংবা কপোত ওড়ানোর এই কাজই তিনি করেছেন আজীবন—কবিতায় এবং সংগ্রামে। কবিকে শ্রদ্ধা।

লেখক: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সূত্র: প্রথম আলো

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত