তসলিমার প্রবন্ধ, নারী-পুরুষ শরীর, বুদ্ধিমত্তা এবং কয়েকটি মিথের অবসান!

প্রকাশ | ০১ জুলাই ২০১৬, ০১:২৫ | আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০১৭, ১২:২৭

মেয়েরা কোনো একটা ভুল করে ফেললেই শোনা যায়- মেয়েদের বুদ্ধি কম, মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় নিচু অবস্থানের অধিকারী মানসিক ও শারীরিকভাবে। আসলেই কি তাই?

এর উত্তর পেতে গেলে আমাদের কয়েকটি মনোবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক রিসার্চ, চিকিৎসা বিজ্ঞানের আধুনিকতম আবিস্কারগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হবে। 

২১শে অক্টোবর ২০১৫ তে ব্রিটেনের সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্যাবলয়েড ‘দ্যা ডেইলি টেলিগ্রাফ’ একটি রিপোর্ট করেছিল। রিপোর্টটি করা হয়েছে একাধিক পৃথিবীবিখ্যাত গবেষকের করা একটি যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন থেকে নিয়ে। টেক্সাস ইউনিভার্সিটি, নিউ ইয়র্কের বাফালো ইউনিভার্সিটি এবং ক্যালিফোর্নিয়ার লুথেরান বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন বিখ্যাত গবেষক মেডিক্যাল সায়েন্সের বিখ্যাত সেজ জার্নালে তাঁদের গবেষণা কর্ম তুলে ধরেন। গবেষণা প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল Effects of Psychological Distance and Relative Intelligence on Men’s Attraction to Women এই জার্নাল থেকে দ্যা ডেইলি টেলিগ্রাফ প্রতিবেদন করে ‘বুদ্ধিমতী মেয়েদের ছেলেরা ভয় পায়’। দুই পর্বের এই গবেষণা প্রতিবেদন মোট ১০৫ জন পুরুষের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে করা হয়। মেয়েদের কাজের আগ্রহ ও মনোযোগ তুলনামূলক বেশি থাকে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে। উচ্চতায় খাটো, কাজকর্মে পারদর্শী স্বল্পবুদ্ধিমত্তার মেয়েদের পুরুষেরা সঠিক পছন্দ বলে মনে করে। তাদেরকে স্মার্ট ভাবে। অন্যদিকে বুদ্ধিমতী মেয়েদের পুরুষেরা ভয় পায়, কারণ তাদের বুদ্ধিদীপ্ত আচরণ পুরুষকে বিব্রত করে। আরও একটি বিস্ময়কর তথ্য গবেষকরা উল্লেখ করেন, সেটি হচ্ছে- বুদ্ধিমতী মেয়েদের পুরুষেরা কম আকর্ষণীয়, যৌনাবেদন নেই ইত্যাদি জাতীয় আখ্যা দেয়ার চেষ্টা করে। 

তসলিমা নাসরিন তাঁর একটি লেখায় পুরুষের প্রয়োজন ফুরাবার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সেটি কোনো রসালো সমালোচনা নয়। বিজ্ঞানের আধুনিকতম আবিস্কার স্টেমসেল নিয়ে। তিনি তাঁর লেখায় জানিয়েছিলেন:

“যে কাজের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল পুরুষের, সে হলো শুক্রাণু তৈরি করা। কয়েক বছর আগেই স্টেম সেলের গবেষকরা জানিয়েছিলেন স্টেম সেল থেকেই স্পার্ম বা শুক্রাণু তৈরি হতে পারে। এতকাল যাবৎ তৈরি করে দেখাতে পারেননি। বিজ্ঞানের বেলায় শুধু মুখের কথায় বিশ্বাস করার ব্যাপার নেই, প্রমাণ দেখাতে হয়, ঘটনা ঘটিয়ে দেখাতে হয় যে ঘটনা ঘটেছে। চীনের একজন ডাক্তার ইঁদুরের স্টেম সেল থেকে স্পার্ম তৈরিকরেছেন। স্টেম সেল ভ্রুণের নাভি থেকে সংগ্রহ করা যায়। যে ক’টা স্টেম সেলের দরকার একটা নতুন শরীর তৈরি করতে, সেগুলো খরচ হয়ে যাওয়ার পর, বাকি অব্যবহৃত স্টেম সেলগুলো পড়ে থাকে নাভিতে। সেই পড়ে থাকা কোষগুলো দিয়েই পরে তৈরি করা যায় শরীরের যাবতীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। ইঁদুরের স্টেম সেল থেকে যদি স্পার্ম তৈরি করে ফেলা যায়, তাহলে মানুষের স্টেম সেল থেকেও তৈরি করা যাবে স্পার্ম। তাই নয় কি? হ্যাঁ তাই। ইঁদুরের স্টেম সেল থেকে তৈরি করা স্পার্ম এখন ইঁদুর ছানা তৈরি করতে ব্যস্ত।

প্রথমে ইঁদুরের ওপর, গিনিপিগের ওপর, অথবা বানরের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়, ভালো ফল পেলে মানুষের ওপর চালানো হয় পরীক্ষা। মানুষের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে যদি ভালো ফল পাওয়া যায়, তবে আমরা অনুমান করতে পারি ঘটনা কী ঘটতে যাচ্ছে। কোটি কোটি স্টেম সেল থেকে কোটি কোটি স্পার্ম তৈরি করা হবে। স্পার্ম ব্যাংক গজিয়ে উঠবে মোড়ে মোড়ে। স্পার্ম ব্যাংক থেকেই স্পার্ম নেওয়ার চল শুরু হবে। স্পার্মের জন্য পুরুষের ওপর নির্ভর করবে না কেউ।

কত কত প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে পৃথিবী থেকে। আমরা মানুষ প্রজাতিকে বিলুপ্ত হতে দিতে চাই না। আমরা চাই যে করেই হোক এই প্রজাতি টিকে থাকুক। সব প্রজাতিই টিকে থাকতে চায়। মানুষ ভিন্ন কিছু নয়। মানব-শিশু তৈরিতে যদি সত্যিই নারী আর পুরুষের যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজন না হয়, যদি নারী একাই যথেষ্ঠ প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য, তবে নারীকে যতই দুর্বল ভেবে নির্যাতন করা হোক না কেন আজ, কাল এই নারীই উঠে দাঁড়াবে, এই নারীই হবে মানবজাতির একমাত্র ভরসা। এই নারীকে অবহেলা অসম্মান আর অত্যাচার নির্যাতন করাই যদি পুরুষের কর্ম হয়, তবে পুরুষেরই বিলুপ্ত হওয়ার প্রয়োজন, মানবজাতির স্বার্থে।”

তসলিমা যেহেতু নারীবাদী লেখক, তাঁর লেখা নিয়ে নানাজনে নানা কথা বলবে। পুরুষ অস্তিত্ব ক্ষুণ্ণ হোক তা পুরুষ কেন, সমাজের অনেক নারীই চায়না। এটি মূলত আর্থ সামাজিক কারণে ঘটে থাকে। যেহেতু এই সমাজে পুরুষকেই একমাত্র উপার্জনক্ষম হিসেবে ধরা হয়, তাই পুরুষের হাতে থাকে একটি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার চাবি। সেই চাবির জোরে পুরুষের কথা নারীকে শুনতে হয়, অধিনস্ততা মেনে নিতে হয়। কিন্তু একুশ শতকের আধুনিক বিজ্ঞানের সবচেয়ে জনপ্রিয়, নন্দিত আবিষ্কার স্টেমসেলের আবিষ্কারকে পুরুষ কীভাবে রুখবে? 
নারী শরীর ভঙ্গুর, ঠুনকো জাতীয় মতবাদ যাদের মনে আলোড়ন তোলে তাঁদের মন খারাপ করিয়ে দিতে কয়েকজন বিজ্ঞানীর নিরলস গবেষণাই মুখ্য। আধুনিক বিজ্ঞান সম্পর্কিত তসলিমা নাসরিনের লেখা ‘পুরুষের প্রয়োজন ফুরিয়েছে’ শীর্ষক বিজ্ঞান গবেষণা শীর্ষক প্রবন্ধ বলছে- ৩০ কোটি বছরে পুরুষ তার ওয়াই ক্রোমোজম থেকে কয়েকশ’ জিন হারিয়েছে। পুরুষ যদি বিলুপ্ত হয়, তাদের ওয়াই ক্রোমোজমের কারণেই হবে, এ কথা বিজ্ঞানীরা অনেক বছর থেকেই বলছেন। এক্স-ক্রোমোজমে বা নারী-ক্রোমোজমে ১০০০ সুস্থ জিন আছে। নারীর আছে দুটো এক্স। তার মানে সুস্থ জিনের সংখ্যা নারীর শরীরে বেশি। একসময় ওয়াই ক্রোমোজমেও এক্স ক্রোমোজমের মতো জিন ছিল। কিন্তু সেসব নষ্ট হতে হতে এখন যা আছে, তা বিজ্ঞানীদের অনেকেই বলেন, স্রেফ আবর্জনা। পুরুষেরশরীরে আছে একটিই এক্স ক্রোমোজম, একা। নারীর যেহেতু দুটো, নারীর এক্সরা শক্তিমান। কিছু বিজ্ঞানী বলছেন, পুরুষের বিলুপ্ত হতে ৫০ লক্ষ বছর লাগবে। কোনও কোনও বিজ্ঞানী বলছেন, এই ৫০ লক্ষ বছরের মধ্যে নিশ্চয়ই এমন বিজ্ঞানী জন্ম নেবেন যিনি ওয়াই ক্রোমোজমের অসুস্থতা সারিয়ে তুলতে পারবেন।

আমরা জানি- একটি মানুষের ক্রোমোসমের শেষ জোড়টি নির্ণয় করে মানুষটি ছেলে না মেয়ে। যদি জোড়ার ক্রোমোসম দুটিই এক্স এক্স হয় তবে সেটি নারী, এবং এক্স ওয়াই হলে সেটি পুরুষের। এক্স ওয়াইয়ের চেহারা পুরুষশাসিত সমাজ যেভাবে কল্পনা করে আদতে তা নয়। এক্সের তুলনায় ওয়াইয়ের চেহারা রীতিমতো খর্বাকার। আমাদের দেশে ছেলেটি পুরুষ না হলে নারীকে যে হেনস্থা সহ্য করতে হয় সেটির দায়ও পুরুষের। সেটিও নারীর নয়। ছেলে হতে হলে যে ওয়াই ক্রোমোসমটির প্রয়োজন সেটি তৈরি হয় শুধুমাত্র পুরুষ শরীরে। সন্তান পুরুষ না নারী হল সেটির দায় কিছুতেই নারীর ওপর বর্তায় না। কিন্তু পুরুষ নিজের দোষেই নারীকে দুষেছে তার বিভিন্ন অপারগতা আর মূর্খতাকে পুঁজি করে। 

নারী বা পুরুষ কার শরীর সবচেয়ে বেশি সুপিরিয়র বা ক্ষমতাবান সেটা বিশ্লেষণ করতে এখন খুব বেশি কিছু লাগেনা। পুরুষকে যেহেতু সন্তান ধারণ করতে হয়না, ঋতুস্রাব হয়না, কাজেই পুরুষ নিজেকে মুক্ত ভাবে। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষায় পুরুষ অস্তিত্বের দিক দিয়ে নারীর তলনায় ভঙ্গুর একটি প্রাণী। একজন মানুষের শরীরের একটি ক্রোমোসমে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন নিউক্লিওটাইডের জোড়া। মানুষের শরীরে থাকে তেইশ জোড়া ক্রোমোসম, যার বাইশ জোড়া এক থাকে নারী শরীরে। একারণে সেক্স ক্রোমোসম(যেটি লিঙ্গ নির্ধারণ করে) বাদে নারীর এক্স এক্স ক্রোমোসমের প্রতিটিই থাকে এক। কিন্তু ছেলেদের ক্ষেত্রে যেহেতু এক্স ওয়াই, তাই এরা থাকে আলাদা। একই ক্রোমোসমের একটির কোথাও ত্রুটি থাকলে অপর ক্রোমোসমটি সেটি কাটিয়ে উঠতে পারে। ধরা যাক টাক মাথার বাবার এক্স ক্রোমোসম মায়ের এক্স ক্রোমোসমের সাথে অবস্থান করে। তখন বাবার জীন থেকে মেয়ের টাকমাথা হওয়ার নির্দেশনা থাকলেও মায়ের জীন এই ক্ষতি পুষিয়ে দেয়! কাজেই চারিদিকে টাকমাথার হাজারো পুরুষ দেখলেও নারীর দেখা মেলে না! 

যেসব পুরুষ এসব তথ্য শুনে মুখ পাংশু করে ফেলেছেন তাদের একটিই বলার আছে- শুধু পেশীশক্তির জোর দেখিয়ে প্রকৃতিতে কোনো প্রজাতিই টেকেনি। ডায়ানোসরসহ জুরাসিক পিরিয়ডের বিশাল বিশাল প্রাণী এর উদাহরণ। নারীকে হেনস্থা করতে, কম বুদ্ধিমান প্রমাণ করতে যারা বদ্ধ পরিকর তাদের শুধু এতোটুকুই বলার আছে- প্রকৃতি নানাভাবে পুরুষকে হেনস্থা করার ব্যবস্থা করে রেখেছে!

লেখক: তরুণ লেখক ও সাহিত্যিক