নারীর মতো মশলাদার টপিক আর নেই

প্রকাশ | ১০ নভেম্বর ২০১৬, ১৯:০৬

ডোনাল্ড ট্রাম্পরে নিয়ে এখন খুব একটা আলোচনা নাই। আলোচনা এখন মেলানিয়া ট্রাম্পরে নিয়ে। ঘরে-বাইরে, স্থলে-জলে-অন্তরীক্ষে। মেলানিয়া ট্রাম্প। গতকাল থেকে আজ পর্যন্ত অন্তত: কয়েকশবার শুনে ফেলেছি "ইসস মেলানিয়া"! কেউ কেউ ইয়ার্কি করে বলছেন, মেলানিয়া আমাদের ভাবী, কেউ কেউ বলছেন, এই খবিশ ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সুন্দরীরে পাইল কিভাবে? এক ভদ্রলোক ইনবক্সে মেলানিয়ার নগ্ন ছবি পাঠিয়েছেন, লিখেছেন, হেয়ার ইজ আমেরিকান ফার্স্ট লেডি!  

ইয়ার্কি বুঝি না এমন তো না, আমার হিউমার সেন্স মন্দ না, সেইসাথে অন্য ইন্দ্রিয়ও খারাপ না। তাই বুঝতে পারি, ইয়ার্কির পাশাপাশি আসলে ঝোল টানছেন পুরুষরা। আহ মেলানিয়া, যদি পাইতাম তোমারে। মানে তোমার শরীররে। 

মেলানিয়া ট্রাম্প কি ছিলেন? মডেল। ৯৫ সালের তার কিছু নগ্ন ছবি ভোটের আগে প্রচারণার সময় প্রকাশ করা হয়েছিল। স্থাপত্যে স্নাতক, পাঁচটা ভাষা জানা মেলানিয়া ট্রাম্প এর নগ্ন ছবি তখন হিলারী শিবিরের দারুণ কাজে লেগেছিল। তখন আমি লিখেছিলাম, নারী তুমি কেবলই শরীর, এর বাইরে কিছু নও। সে আমেরিকা হোক কি আদাবর। নারী আসলেই শরীর ছাড়া কিছু না। ফার্স্ট লেডি হয়েছে বলেই কি তার গা থেকে নগ্ন নারীর ছাপ সরবে?

আমেরিকার মানুষ রেসিস্ট, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নারী চায় না-নানান রাজনীতির হিসাবে এই কথা বালখিল্য মনে হতে পারে। স্যান্ডি বার্নান্ডস সহ অন্তত আরও কয়েকটি কারণ রয়েছে না তার না জেতার। নারীরাও এমনকি ভোট দেননি হিলারীরে অথচ ট্রাম্প নারী নিপীড়নকারী। নারী মশলাদার জিনিস, ঋণাত্বক খবরে তারে কাজে লাগে, তার উপর নিপীড়ন নিয়ে ভাবার কিছু নাই। তাই বোধহয় ওই প্রচারণা বা সত্য তথ্য যাই হোক বিশেষ কাজে লাগে না।

ওই যে ভদ্রলোক মেলানিয়ার নগ্ন ছবি পাঠিয়ে লিখল, হেয়ার ইজ ফার্স্ট লেডি, সে আসলে এই মডেল, নগ্ন নারীটিকে ফার্স্ট লেডি মানতে পারছে না। বা হতেও পারে, মজা পেয়েছেন তিনি। এই ভেবে যে দেশ একটা! তবে পুরুষতন্ত্র যে পুঁজিবাদী দেশগুলোয় নারীর জন্য বিভিন্ন ভূষণ তৈরি করে তার উদাহরণ এই "ফার্স্ট লেডি" পদ। যিনি প্রেসিডেন্ট তার বউ ফার্স্ট লেডি। এই ফার্স্ট লেডি যতটা না রাজনৈতিক তার চেয়ে অনেকবেশি সামাজিক। ফার্স্ট লেডি কি করলেন, কি পড়লেন, কিভাবে বাচ্চা মানুষ করলেন সেসব খবর হয়। ফার্স্ট লেডি ছিলেন বলেই বিল ক্লিনটন যা যা করেছিলেন মনিকা লিউনেস্কির সাথে তা মেনে নিয়েছিলেন হিলারি। সমাজ খুব অদ্ভুত এক বিষয়। আমেরিকার সমাজও। আর নারীর মতো মশলাদার জিনিস দ্বিতীয়টা নাই। তাই যে আমেরিকায় নারী-পুরুষের সম্পর্ক ডালভাত সেখানে প্রতিবার নির্বাচনের আগে নারী একটা ইস্যু হয়, মেলানিয়াও ইস্যু হয় আবার ফার্স্ট লেডি হয়ে গেলে ভেতরে ভেতরে তারে নিয়ে ঝোলটানার পাশাপাশি তারে উপজীব্য করে তোলা হয়। আমার জানতে সাধ, হিলারী জিতে গেলে বিল ক্লিনটনরে কি বলা হতো? ফার্স্ট এ্যাডামস বলে একটা শব্দ তারা ভেবে রেখেছিল, তারে নিয়ে কি এতো মাতামাতি হতো?
 
এই যে প্রায় সারাবিশ্বেই সারাক্ষণ, সবকিছুকে সরিয়ে নারীকে একটা শরীর হিসেবে দেখা, এই নির্যাতন থেকে মুক্তির উপায় কি? পুঁজিবাদী সমাজে নারী নিজেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজেকে দ্রষ্টব্য করে রাখতে চায়। আমেরিকার মেলানিয়া হয়তো তার বাইরে নয়। আর আমাদের মতো তিন নম্বর বা নম্বর ছাড়া বিশ্বের দেশগুলোতে সংস্কৃতি আসে উপর থেকে চুইয়ে চুইয়ে পাহাড় থেকে নীচের দিকে জল গড়ানোর মতো। হয়তো মনে মনে অনেক নারীও মেলানিয়ার মতো ছিপছিপা, সুন্দর তনুর মতো হতে স্বপ্ন দেখছে। আর আমেরিকানদের ভ্রষ্টতা এবং বিকৃতির বাই প্রোডাক্ট হিসেবে আমাদের পুরুষগুলো লোল টানছে, আরও কি কি করছে তা না-ই বলি।

সম্ভবত সম্মান-অসম্মান, নগ্নতা এইসব থেকে নারী যদি নিজেরে ইরেলিভেন্ট করতে না পারে, নিজেকে নিজেই পূর্ণ মানুষ হিসেবে না দেখতে শেখে তাহলে মনে হয় না এই সমস্যার কোন সমাধান আছে। 

লেখক: সাংবাদিক