ধর্ষকের চাষ করি আমরাই

প্রকাশ | ০৭ নভেম্বর ২০১৬, ২২:১৬

শিশু জন্মের সময় একজন মায়ের কার্ভিকাল চেঞ্জ নিয়ে একটা এনিমেশন দেখছিলাম। দেখতে দেখতে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়লো এই যে মায়ের এতো ত্যাগ আর কস্ট সহ্য করার মধ্যে দিয়ে একজন শিশুর জন্ম হলো বড় হয়ে সেই কিনা নিপীড়ক হয়ে উঠে। মায়ের যোনী দিয়ে গড়িয়ে পড়া শিশুটিই অন্য নারীর যোনীতে জোরপূর্বক প্রবেশ করে যোনী ক্ষতবিক্ষত করে, মায়ের স্তন পান করে পুষ্ট হয়ে উঠে ভিড়ের সুযোগ নিয়ে নারীর বুকে হাত দেয়, আঁচড়ে কামড়ে দেয়, নারীর অপ্রস্তুত মুহুর্তে তার দিকে অপমানজনক মন্তব্য ছুড়ে আনন্দ নেয়। কিভাবে শিশুটি একটি ধর্ষক হয়ে বড় হয়, অথবা মনের গহীনে পোষণ করে ধর্ষণেচ্ছা? ধর্ষক আর সুযোগের অভাবে ভদ্র এই দুই গোত্রেরতো আসলে তফাত নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো সামাজিকীকরণের কোন কনটেক্সটে ছেলেটি পুরুষ এবং ধর্ষক হয়ে উঠে কিংবা মেয়েটি হয়ে উঠে ভীত, দূর্বল ও ধর্ষণের নাজুক টার্গেট।

আমি মা-ই শিশুটিকে বড় হয়ে উঠার প্রতিটি বাঁকে বাঁকে ধর্ষক করে তুলছি। আমি আমার মেয়ের মা/বাবা হয়েই ধর্ষকামীর কামনার বৃক্ষের পরিচর্যা করে চলছি। দায়ী কে, দায়ী আমি মা, আমি বোন, আমি পিতা, আমি স্ত্রী, আমি দাদা, দাদী, নানা, নানী, খালা, ফুফু, চাচা, মামা, আত্মীয়, আমি মানুষ। পত্রিকায় ধর্ষণের খবর পড়ে আমার মন যত করুণ হয়েই উঠুক না কেন, চোখ যতই ছলছল করে উঠুক না কেন, আমার নিজ অবস্থান থেকে আমি এর দায় এড়াতে পারবো না, পারবো কি? কিছুটা দায়ভার কি আমারও না যখন আমিই টেনে নিয়ে চলছি এই ধর্ষকামি সংস্কৃতি!

যখন আমি আমার ছেলেকে শেখাই যে তুমি শক্তিমান, তোমার আছে বিশেষ ক্ষমতাদন্ড, তুমিই হবে কারো প্রভু, স্বামী, চাইলেই তুমি হরণ করতে পারো যে কোন মেয়ের সম্মান, কিন্তু হাজার চাইলেও তুমি নিয়ন্ত্রন করতে পারো না তোমার শিশ্নর উত্থিত হওয়াকে কারণ এতো সূর্য পুর্বে উদিত হওয়ার মতই অমোঘ তখনই আমি ধর্ষকের পক্ষের লোক। আমরাই কি ছেলেটিকে শেখাই না যে তার লজ্জার কিছু নেই, সে প্যান্ট ছাড়া ঘুরতে পারে অনেক বছর পর্যন্ত, প্রাকৃতিক কর্ম সারতে পারে যেখানে সেখানে কারন শিশ্ন তার লজ্জা নয় অহংকার। বড় হতে হতে তো ছেলে সন্তান জন্ম নেয়ায় খুশিতে দাদী নানিদের তার লিঙ্গ নির্ধারণকারী অঙ্গটি নিয়ে কম আদিখ্যেতা করতে দেখি নি, কারন ঐ অঙ্গটিই যে তাকে বংশের বাতিদানকারী করে তুলেছে, নিশ্চিত করেছে তার বাবার সম্পত্তির পূর্ণ অধিকার। 

ছেলে শিশুটিকে কয়জন আমরা শিখাই যে গোপন অঙ্গ গোপন, সে সবার জন্যই। আমরাতো মেনেই নেই গোপনীয়তা আর রাখঢাক শুধুই মেয়েদের জন্য কারণ তার আছে মুল্যবান সতীচ্ছদ্য আর পুরুষের কামনার যোনী, তাকে আড়ালে রাখো। আর তাই তার যোনীর দ্বার রক্ষা করাই পরিবার পরিজনের একমাত্র ধ্যান অষ্টপ্রহরের চিন্তা, কারণ মেয়ে আর তার পরিবারের সকল সম্মান ওখানেই, তা একবার গেলোতো গেলোই শত সাধনায় তা আর পুনরুদ্ধারের উপায় নেই, সকল অসম্মান পরিবারের আর মেয়েটির অবস্থা মৃতপ্রায় সে হারিয়েছে তার সবকিছু! আমরা ধরেই নেই পুরুষের কামনা নিয়ন্ত্রণের ঊর্ধ্বে, তাই আমরা আমাদের সন্তান, স্বামীর বা পিতার নিপীড়নের ঘটনাগুলো আড়াল করি, ক্ষণিকের দুর্বলতা ভেবে ক্ষমা করে দেই, দোষারোপ করি নিপীড়িতের চাল-চলন, পোশাক-আশাক, মেলামেশা, পরিবারের শিক্ষা, ভুল সময় ভুল জায়গায় ভুল ভাবে তার উপস্থিতিকে দায়ী করি। পুরুষের অদম্য কামনার বিপরীতে নারীর উচ্ছৃঙ্খলতার দৃষ্টান্ত খুঁজি হন্যে হয়ে। সে উচ্ছৃঙ্খল কেননা সে জিন্স শার্ট পরে পুরুষকে প্রলোভিত করেছে, অথবা কামিজ পড়লে ওড়না ঠিকমত বুকে দেয় নি, ওড়না বুকে দিলে মাথায় কাপড় দেয় নি, মাথায় কাপড় দিলে হিজাব পড়েনি, শুধু হিজাব পড়লে বোরকা পড়েনি, বোরকা পড়লে চোখ বা পায়ের পাতা বা হাত ঢাকেনি। আর যখন তার সকল ঢাকা থাকে অথবা সে শিশু বা তার ঢাকার বয়স হয়নি, তখন আমরা হতবাক হয়ে ভাবি, 'তাইতো এটা ক্যামনে হইলো', আসলে নারী হয়ে (পড়ুন যোনী নিয়ে) জন্মানোই পাপ। আমাদের চিন্তায় 'নারীর কামনা'- এইটা আবার কি জিনিস? যার অস্তিত্বই নাই তা আর ক্নট্রোল করার কি আছে, তবে আমরা সবাই যা জানি তা হলো, কিছু খারাপ মেয়েদের এটা থাকে। সাদাসিধা, নিরুপায় পুরুষকে উস্কানি দিয়ে নষ্ট করে তারা। 

আমি চিন্তা করি আমি বা আমার মেয়েটি হবে নরম, কোমল, লাজুক ললিতলবংগলতা, অথবা হবে বার্বি ডল ফিগারের সবার আরাধ্য, পুরুষের কামনার বস্তু কারণ পুরুষ এর রমন করার বাসনা নিয়েই সে রমনী। কয়জন নারী আমরা চাই আমি হবো আত্মনির্ভরশীল, স্ট্রং, স্বামী গর্বে গর্বিত নই নিজ গুণে গুণান্বিত। আমরা চাই আমার ছেলেটি হবে অফিসের বড় চাকুরে গৃহের কর্তা, পিতা মাতার আশ্রয়। মধ্যবয়সী নারীও তার নিরাপত্তার জন্য ৫ বছরের ছেলে শিশুকে সঙ্গে করে নিয়ে যায়, ছেলে যে সে। এই যে বিভাজন চর্চা এর শুরুতো হয় মাতৃজঠরে লিঙ্গ নির্ধারনের পর থেকেই। আমাদের সমাজে নবজাতক শিশু জন্ম নেয় না জন্ম নেয় ছেলে আর মেয়ে। আমরা মায়ের পেটে থাকতেই নির্ধারণ করে দেই কে ক্ষমতাবান আর কে অনুগ্রহীতা, কে চাপিয়ে দিবে আর কে চাপে পড়বে, কে অধিকারী হবে আর কে অধীনে থাকবে, কে হুকুম করবে কে মান্য করবে, কে ধমক দিবে আর কে ভয়ে কুঁকড়ে যাবে, কে নিপীড়ন করবে আর কে হবে নিপীড়িত। এতো আমরাই।
 
এভাবেই আমাদের চিন্তায় আমরা ধর্ষকের চাষ করি, তার জন্য রাস্তা তৈরী করি, প্রতিনিয়ত ধর্ষিতার বেঁচে থাকার যুদ্ধকে অস্বীকার করি, তাকে বার বার হত্যা করি। মুখে যতই বড় কথা বলি কয়জন আমরা মেনে নিতে পারবো আমার ছেলের বউ এর এরকম একটি অতীত থাকলে? যতই আমরা বেদনায় করুণ হই আমার চিন্তায় একজন ধর্ষিতা তার এই পরিচয়ের কতটা ঊর্ধ্বে উঠতে পারে? আমার কাছে কি আহত ছিনতাইয়ের শিকার নারীটি আর ধর্ষণে আহত নারীটি সমান মর্যাদা পায়? আমরা আমাদের প্রশ্ন করি আমাদের উন্নত করি।

এর সমাধানও হতে পারি আমরাই। এই জেন্ডারড সমাজে আপনি আপনার সন্তানটিকে মানুষ হিসেবে বড় করুন, ছেলে বা মেয়ে হিসেবে নয়। তাকে শেখান অন্য আর সব স্পিসিস এর মতই পুরুষ আর নারী নিয়েই মানব জাতি, মানুষ আর নারী নিয়ে নয়, দুজনেই সমান মানুষ। দুজনেরই সমান অনুভূতি, কষ্ট-দুঃখ-আনন্দ-সম্মান-অপমান-ব্যথা-বেদনা-সুখ-ভালোলাগা-ভালোবাসা-ঘৃণা-আত্মনিয়ন্ত্রণ-আত্মমর্যাদা সব সমান। ভালো কাজে যেমন সবার মান বাড়ে, তেমনি অপরাধ করলে অপরাধীর মান যায়, সে সব শাস্তি আর ঘৃণার দাবিদার। মর্যাদা হলো আত্মসম্মানবোধ ও আত্মনির্ভরশীলতা, তা নিজের হাতেই অন্য কারো কাছে বর্গা দেয়া না, আবার অন্যের দ্বারা অর্জন করাও না। শুধু মুখে বলার জন্য না, নিজে বিশ্বাস রেখে নিজের আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। পরিবর্তন আনতে হবে নিজের চিন্তায়, মননে, চর্চায়। কার জন্য? আমার জন্য, আমার মা, মেয়ে, পূত্রবধু, এবং সর্বোপরি আমার ছেলেকে পুরুষ থেকে মানুষ করে তোলার জন্য।

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক