x

এইমাত্র

  •  বরেণ্য সংগীতশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ আর নেই

মানুষ নিজেই বেছে নিক তার নর্মস

প্রকাশ : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৭:০৫

ক্লাস টু এ পড়ি যখন, অনেকেই কানের লতি ধরে মাকে বলতো, "এখন নরম আছে! এখনই ফুঁড়ায় দেন!" আমার মা মেয়ের ফ্যাশন বিষয়ে অপেক্ষাকৃত অসচেতন ছিল বলে ক্লাস ফোরে আমার কান ফুঁড়ানো হইলো। আমি ড্যাং ড্যাং করে লাফাতে লাগলাম, কারণ অনেকেই তখন আমাকে বলা শুরু করেছে "এই তো মেয়ে মেয়ে লাগছে এখন"! বয়কাট চুল দিয়ে ছোট দুইটা কানের দুল পড়ে আমি হেভি ভাব দেখাইতাম। আমি কখনো সেদিন প্রশ্ন করি নাই, মেয়ে হতে গেলে কেন আমাকে ওই অল্প বয়সে কান ফুঁড়াতেই হবে? কেন কানের প্যাক প্যাক পচন আমাকে সহ্য করে, স্কুলের সামনে আচার খাওয়াতে নিষেধাজ্ঞা মানতে হবে?

সেদিন আমার এক প্রিয় ছোট পিচ্চি (যার বছর দুই আড়াই হবে) তার মা কানে ফুড়ুৎ করে ফুঁটা করে দিল। বেচারি লাল মুখ নিয়ে বসে আছে। কানে ব্যথা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, "এখনই কি লাগছে! বড় হোক! যত ইচ্ছা ফুঁড়াইতো!" পিচ্চির মা আমারে মৃদু ভৎসর্না দিয়া বলে, "তুমি তো অমনই বলবা! আফটার অল ও মেয়ে! তোমাকে বুঝতে হবে!"

আমার কানপাকা শৈশব নিয়ে আমার আফসোস হয় মাঝে মাঝে! মেয়ে হবার কি প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছি! শার্ট, ফতুয়া, জিন্স পরলে ব্যাটা ব্যাটা লাগে দেখে কত লাল লাল ফতুয়া আলমারিতে তুলে রেখে দিয়েছি। তাই আমি ওই মাকে বাধা দেই৷ কিন্তু কে শোনে কার কথা!

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যে জেন্ডার নর্মস তৈরি করে দিয়েছে সেখান থেকে বের হবার কলিজা সবার নাই! এই যে সোসাইটি বলে দিছে, শাড়ি নারীর পোশাক! এখন কোন ছেলে চাইলেও শাড়ি পরতে পারে না! তবে মেয়ে চাইলে প্যান্ট শার্ট পরতে পারে! কারণ দ্বিতীয় লিঙ্গের প্রথম লিঙ্গের মতো সাজপোশাক মানায়। তারা উঁচু লেভেলে উঠতে পারে। কিন্তু প্রথম লিঙ্গের তো আর দ্বিতীয় লিঙ্গের মতো সাজপোশাক মানায় না! ক্ষমতা, ইগো বলে একটা ব্যাপার আছে! লেভেল নামালে চলবে?

আমারে অনেকে বলে বস্ত্র স্বাধীনতা নিয়ে আমাদের অঞ্চলের নারীবাদের বেশিরভাগ আলোচনা হয়ে থাকে! কিন্তু তাও কি এই অবরোধ থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি?

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ঠিক করা নর্মস না মানলে সমাজ কি আমারে মেয়ে বলে মানে! তাই এখনো কান ফুঁড়ানো দিয়ে আমাদের শৈশব শুরু হয়! তারপর জীবনভর মেয়ে হবার প্রাণান্তকর চেষ্টা চলতে থাকে। ভয়ে থাকতে হয়, কখন না কখন পুরুষতান্ত্রিক সোসাইটি এসে না জানি বলে, "তুমি সহী নারী না"!

এই সমাজ আপনার আইডেন্টিটি ক্রিয়েট করে দেয়। আপনি সেটার বাইরে যেতে পারেন না! আপনি মানুষ, ফ্রি উইল জীব! অথচ নর্মস মানাতে আপনার স্বাধীনতা নাই! এর চেয়ে প্যাথেটিক জীবন কিছু হয় না।

মেয়ে হতে গেলে কান ফুঁড়ানো লাগে না, আবার ছেলে হতে গেলে চুলে ফুল গুঁজাতে মানা নাই! এই সহজ জেন্ডার নর্মস বুঝলেই, অনেক সমস্যার সমাধান হয়! যে বাচ্চা দুই বছর বয়সের তারে কান ফুঁড়াইয়া মেয়ে বানানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা আসলেই কাজের কথা না। সে বড় হোক! সে কান ফুঁড়াবে কি ফুঁড়াবে না, নাকফুল পরবে কি পরবে না, ট্যাটু আঁকবে কি আঁকবে না, কাজল দিবে কি দিবে না, চুল বড় রাখবে কি রাখবে না" এসব তারেই ঠিক করতে দেন!

সেই ঠিক করুক তার জেন্ডার, তার নর্মস। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, পরিবার কিংবা রাষ্ট্রকে এই দায়িত্ব দেবার কোনই মানে নাই!

লেখক: অ্যাক্টিভিস্ট

মুক্তমত বিভাগে প্রকাশিত লেখার বিষয়, মতামত, মন্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব। লেখকের মতামত, বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে jagoroniya.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরণের দায় গ্রহণ করে না।
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত