x

এইমাত্র

  •  বরেণ্য সংগীতশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ আর নেই

এইসব মহান দিবসে

প্রকাশ : ০৮ মার্চ ২০১৯, ১৫:৩৮

আকিমুন রহমান

সত্যি বলছি, এই লেখাটি লিখে ওঠার সময় একটা আশ্চর্য অশৈলী ব্যাপার ঘটেছে! আমি খুব গুরুগম্ভীর মনে, মহৎ বাক্যাবলি রচনা করার জন্যই নিজেকে একেবারে সঁপে দিয়েছিলাম! কারণ, একটি মহান দিবস বিষয়ে লেখার জন্য ফরমাশ পেয়েছি আমি! সেটা তো খুব হালকা-পাতলা ব্যাপার নয়! এমন ক্ষেত্রে সিরিয়াস থাকাই তো বিধি? তাই না? 

কিন্তু কিসের কী! দেখি কি- যতই আমি লিখতে যাচ্ছি গুরুতর কথা, ততই কি না সেসব কথা আপনা থেকে হয়ে দাঁড়াচ্ছে কেমন জানি একটা স্বপ্ন-বৃত্তান্ত! নিজ আঙুল দিয়ে লিখছি কঠিন সব কথা, অথচ কিনা তারাই আপনা থেকে হয়ে উঠছে নরম কেমন এক গল্প-ঢেউ!

তো, কী আর করা! সেই সামান্য রকমের গল্প-ঢেউকেই পাঠালাম আপনার কাছে, প্রিয় পাঠক!

দুই
হয়েছে কী, এই তো দিন দুই হয়, আমি একটা বিদ্ঘুটে স্বপ্ন দেখেছি! স্বপ্নে দেখি যে, একদা (কোনো দৈব অনুগ্রহে কে জানে!), সবচেয়ে নামি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি আমি! জাগনা দুনিয়ায় আমি না এখন ভাদাইম্মা? স্বপ্নে দেখি যে, আমি ফুল প্রফেসর! বোঝো কাণ্ড!

স্বপ্ন আমাকে দেখায় যে, যেই অনুষদে আমার বিভাগ, সেই অনুষদটি বিষম নারী অধ্যুষিত! সকল বিভাগে নারী শিক্ষকের উপস্থিতিই বেশি! বেশি। বেশি। সেইখানে পুরুষ শিক্ষক আছেন বটে, তবে অল্প গুটিকয় তারা! সেই কারণে পুরো অনুষদে যেন হাসি বেশি! অনেক অনেক হাসি!

আরও দেখি কি, সেইখানে নারী শিক্ষক যেমন বেশি; তেমনি সেইখানে ক্লিনারও অগুনতি! নারী তারা সকলেই! ডজন ডজন!

তো, পড়াতে পড়াতে দিন যেতে যেতে একদিন দেখি অনুষদজুড়ে মহাতোলপাড়! 

কী? না! ৮ মার্চ আসছে! অন্য অনুষদ করলে করবে, না করলে নাই; কিন্তু এই অনুষদে সেই মহান দিবসকে অতিমর্যাদার সঙ্গে যাপন করতেই হবে! 

কেমন করে করে কোন কোন রীতিতে কী কী করলে দিবসটির মহিমা আরও জাঁকালো করা সম্ভব, সেইসব নিয়ে মিটিংয়ের পর মিটিং হতে থাকে! স্বপ্নের মধ্যে, আমি বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ কেউ না হয়েও, ওইসব মিটিংয়ে উপস্থিত আছি! কত মহতী পরিকল্পনার কথা শুনছি। চাপা কলহ-বিবাদও হতে দেখছি সীমাহীন!

এই মতে যেতে যেতে দেখি কি, ধুম করে ৮ মার্চ চলে এসেছে! অনুষদের মস্ত চাতাল সাজিয়ে তোলা হয়েছে শুধু বেগুনি আর গোলাপি রঙের ঝালরে ঝালরে! হবে না কেন! ওটাই তো নারী দিবসের জন্য নির্ধারিত রঙ!

আমার সহকর্মী নারীগণ বেগুনি ও গোলাপি মিশেলের পোশাকে ঝিলমিল করছেন! তাদের চুলে চুলে গোঁজা আছে পার্পল অর্কিডের গুচ্ছ! বাহ! কী মনোমুগ্ধকর! 

শুধু নারীরাই সেইখানে গোলাপি-বেগুনি আভাময়ী নন! দেখি যে, পুরুষ সহকর্মীগণের ফুলস্লিভ শার্ট বা পাঞ্জাবিও হয়ে আছে কোনো না কোনো রকমে গোলাপি-বেগুনি! তাদেরও হাতে হাতে অর্কিডের গুচ্ছ! 

টেবিলে সাজানো আছে মস্ত এক কেক! তার ওপরে ক্রিম-রচিত থোকা থোকা ফুল! গোলাপি-বেগুনি! আহা! কী শোভা! কী বাহার সবকিছুতে! 

স্বপ্নে সেই বাহার দেখে দেখে আহদ্মাদিত হওয়ার খুব বেশি ফুরসত পাই না! কারণ আমি হঠাৎই দেখি, নারী দিবস উদযাপন কর্মের যিনি মূল শক্তি, যিনি আমার বিভাগীয় প্রধান, তিনি হতভম্ব চোখে আমার দিকে চেয়ে আছেন! আছেন তো আছেনই! 

কী ব্যাপার? আমি ভেবে ভেবে থইহারা হই! তিনি বরাবর সুদর্শন! আজকের এই বেগুনি-গোলাপির আভায় তিনি মনোহর হয়েই আছেন! কিন্তু আমার দিকে ছুড়ে দেওয়া তার দৃষ্টি অমন ত্রূক্রর দেখায় কেন? অমন বিবিমিষা-জড়ানো দেখায় কেন?

আমি কি প্রাতিষ্ঠানিক কোনো বিধি পালনে গাফিলতি করেছি? কী ভুল হলো রে বাবা! আমি স্বপ্নের মধ্যেই তন্নতন্ন করে আমার ভুল খুঁজতে খুঁজতে পেরেশান হয়ে যেতে থাকি! কিছুই খুঁজে পাই না! 

এমন সময় কে একজন যেন ফিসফিসিয়ে আমাকে বলে, 'এইটা কী পরলেন আজকা আপনি? ফ্যাকাল্টি মেম্বার হয়ে ডিপার্টমেন্টের ডিসিপ্লিন মেইনটেইন করলেন না!'

ওরে মা! আমি আঁতকে উঠে ফ্যাকাসে হয়ে যাই! কী করেছি আমি! আমি তো বেগুনি বা গোলাপি বর্ণের কোনোটাতেই নাই! 

আমি পরে আছি সূর্যমুখী হলুদ শাড়ি! তাতে নিমপাতা রঙের পাড়! হায় হায় হায়!

নারী দিবসের জন্য বরাদ্দ করা রঙকে আমি শরীরে জড়াই নাই! আমি তবে কেমন নারী? এমন ভুল আমি কেমন করে করলাম? 

এমন ভুলকে আমার বিভাগীয় প্রধান কিছুতেই নিপাট ভুল বলে মেনে নেবেই না! অই তো দেখা যায় তার দৃষ্টি! সেই দৃষ্টি পরিস্কার বলছে, আমার এই আচরণ হচ্ছে পরিকল্পিত এক ষড়যন্ত্র! মহান নারী দিবসের মহতী সব উদ্যোগকে কালিমালিপ্ত করার হীনচক্রান্ত! এবং আমার অই ডিসিপ্লিন ভঙ্গের বিষয়টিকে ইগনোর করার কোনো উপায় নাই-ই!

আমার অই হীনকর্মের সমুচিত শাস্তি বিধানের জন্য তিনি কতটা কী করবেন বুঝতে না পেরে, কঠিন গলায় অফিস সহকারীকে ডাকেন! তারপর আমি শুনতে পাই যে, তিনি তক্ষন তক্ষন আমাকে কঠিন রকমে শোকজ করার জন্য হুকুম দিচ্ছেন!

উফ! সেই শোকজের চিন্তায় জরজর আমার হাতেই কে জানি তক্ষুনি এসে এক টুকরা পেস্ট্রি ধরায়ে দেয়! 

ভ্যানিলা আর চকলেট থরথর পেস্ট্রি খণ্ডের ওপর বেগুনি-গোলাপি ক্রিম! এরে আস্বাদ করার লোভ সামলানো কি যায়? যায় না!

যত শোকজের ধমকিই থাক না মাথার ওপরে, আমি পরোয়া করব না! এরে আগে মুখে পুরবো, তারপর দুনিয়াদারি!

সেই পেস্ট্রি মুখে তোলার জন্য আমি একটু ঘুরে দাঁড়াই! তাতে একটুখানি পেছনে ফেলে দেওয়া যায় মূল উৎসব-উল্লাসকে! একটুখানি বিজনতার দিকে মুখ করে দাঁড়ানোও হয়ে যায় আমার! 

কিন্তু কী থেকে কী হয় দেখো তো! কাকে বিজনতা বলি? অই যে একটু দূরে লেডিস ফ্যাকাল্টি ওয়াশ রুমের দরোজা! সেই দরোজার পাল্লার আড়ালে নিজেদের যথাসাধ্য আড়াল করার চেষ্টা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ক্লিনার মেয়েগুলা! ডজন ডজন! 

একের পেছনে অন্যজনের লুকিয়ে যাবার ঘোর চেষ্টাটা আছে তাদের শরীরে; কিন্তু তাদের জোড়া জোড়া চোখ চেয়ে আছে আমাদের সুশীল উৎসবের দিকে! চেয়ে আছে আমার পেস্ট্রি খণ্ডের দিকে!

দেখ, কেমন দৃষ্টি সেই চোখদের! পুড়ে আংড়া হয়ে যাওয়া গাছ-গরানের মতো খাউখাউ-হু হু! সেই দৃষ্টি দেখে প্রাণ ছ্যাতছেতিয়ে না উঠে পারে? পারে?

এরা কেমন নির্লজ্জ দেখ তো! কেমন দেখ তো! আমার রাগ হতে থাকে! আবার কেমন ঘৃণা হতে থাকে! আমাকে ঘৃণা হতে থাকে! নিজেকে ঘৃণা হতে হতে আচমকা আমার ঘুম ভেঙে যায়! 

ভাগ্যিস স্বপ্ন!

লেখক: কথাসাহিত্যিক
প্রথম প্রকাশ: সমকাল

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত