x

এইমাত্র

  •  করোনার মধ্যে তিন মাসে ২০৬ নারী-শিশু ধর্ষণের শিকার
  •  ৩ হাজার মেডিকেল টেকনোলজিস্ট নিয়োগের অনুমোদন প্রধানমন্ত্রীর
  •  গত ২৪ ঘন্টায় করোনায় নতুন সংক্রমিত ২৮২৮ জন, মৃত ৩০ জন
  •  বিশ্বে করোনায় মোট মারা গেছেন ৩ লাখ ৯১ হাজার ৯৯৭ জন
  •  বিশ্বে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ ৩২ লাখ ২৭ হাজার ৯৭৫ জন

'অনলাইন ব্যবসা খুব সহজ-এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসুন'

প্রকাশ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৫:৩৩

জাগরণীয়া ডেস্ক
Vermilion এর অন্যতম কর্ণধার, উদ্যোক্তা ফেরদৌস আরা মাহফুজ

বিশ্বায়নের যুগে বাড়ছে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা। অন্যের দ্বারে চাকরি না খুঁজে বর্তমানের তরুণরা পড়াশুনা শেষ করে নিজেরাই চেষ্টা করছেন নিজেদের জন্য কিছু করার। ফেসবুককেন্দ্রিক অনলাইন ব্যবসা তাই সাড়া ফেলেছে সকলের মনে। বিশেষ করে নারীরা এই প্ল্যাটফর্মকে বেছে নিয়ে নিজেদের একদিকে যেমন স্বাবলম্বী করেছেন তেমনি অবদান রাখছেন দেশের অর্থনৈতিক বাজারে। তেমনি এক তৃণমূল সফল উদ্যোক্তা সুনামগঞ্জের ফেরদৌস আরা মাহফুজ। এক সন্তানের জননী। ছোট্ট এক শহরে সংসার সামলে তিনি শুরু করেন নারীদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে ফেসবুকভিত্তিক অনলাইন পেইজ "Vermilion"। সাথে ছিলেন তার ব্যবসায়িক দুইজন পার্টনার। ছয় বছরের উদ্যোক্তা জীবনের নানা গল্প নিয়ে জাগরণীয়ার সাথে আড্ডা দিলেন "Vermilion" এর অন্যতম কর্ণধার ফেরদৌস আরা মাহফুজ।

জাগরণীয়া: কিভাবে মনে হলো "Vermilion" শুরু করা উচিত। এর পেছনের গল্প জানতে চাই-

ফেরদৌস আরা মাহফুজ: আজ থেকে প্রায় ছয় বছর আগের কথা। আমি ছিলাম একটি প্রাইভেট কলেজে লেকচারার, প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান যেহেতু ০৬ মাস মাতৃকালীন  ছুটি তারা দিবেনা। যেকোন ১মাস ছুটি দিবে এবং অবশ্যই বিনা বেতনে। এর বেশি ছুটি নিলে আমার সাবস্টিটিউট কাউকে দিয়ে যেতে হবে। কিন্তু দুর্ভগ্যজনকভাবে আমার মিস ক্যারেজ হয়ে গেলো। আমি আর জয়েন করলাম না, চাকরি ছেড়ে দিলাম। আমি ভেবে দেখলাম প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে আমার পক্ষে চাকরি করা সম্ভব না, কারন ভবিষ্যতে আমার আবারো ছুটি লাগবে আর তখন আবারো মানসিক চাপে পড়তে হবে। তখন আমি শুরু করলাম আমার নিজের স্বপ্ন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। স্বপ্ন বলছি কারন আমি স্কুল জীবন থেকে আর্ট,ডিজাইন এই বিষয়ে পড়তে চেয়েছিলাম, নিজের বুটিক শপ করার খুব আগ্রহ ছিল। কিন্তু শেষ অবধি এই বিষয়গুলোতে আমি পড়তে পারিনি। আমি সব সময়ই ইচ্ছাটা মনে পোষণ করেছিলাম। চাকরি ছেড়ে দিয়ে আমি শুরু করলাম আমার নিজের স্বপ্ন প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। বুটিক শুরু করার চিন্তাটা আমি আমার হাজব্যান্ডের কাছে শেয়ার করলাম এবং সে খুব উৎসাহ দিলো আমাকে। সে জানত যে আমার এই বিষয়ে আগ্রহ অনেক বেশি ছিলো, তাই আমাকে অনেক বেশি সাপোর্ট করেছিলো। সে বলেছিলো জীবনে রিস্ক না নিলে কিছু হবে না, ব্যবসা মানেই লাভ/লোকসান  থাকবেই, কিন্তু যেহেতু এটা তোমার প্যাশন আমার বিশ্বাস তুমি পারবে। কারন, এই কাজের প্রতি তোমার আগ্রহ প্রবল তুমি এটা করে আনন্দ পাচ্ছো। যে কাজে তোমার মন ভালো থাকবে, বারবার করলেও তুমি বিরক্ত হবেনা তা তোমাকে সফলতা এনে দিবেই একদিন।  

তার মাস খানেক পর আমাকে বলেছিলো এই বছর তোমার জন্মদিনের গিফট্ হলো তোমার বুটিক শুরু করে দেয়া। সে আমার হাতে কিছু টাকা দিয়েছিলো খুব বড় কোন বাজেট কিন্তু না, যা আমার কাছে শুধু টাকা না আমার স্বপ্ন। সেই থেকে আজ ৬ বছর হতে চলেছে আমাদের পেজের। এই সাপোর্টটা সবাই পায়না, আমি মনে করি সবাই এইরকম সাপোর্ট পেলে আরও অনেক বেশি নতুন উদ্যোক্তা তৈরী হতো এবং টিকে থাকতো। এখনও আমি যদি একটু ভিন্ন কিছু নিয়ে কাজ করার কথা‌ চিন্তা করি, যা ক্লায়েন্ট গ্রহণ করবে নাকি করবে-না রিস্ক থেকে যায়, তাতেও আমি সাহস পাই শুধু আমার দুই পার্টনার আর আমার হাজব্যান্ড থেকে।

জাগরণীয়া: খুবই ভালো লাগলো যে শেষ পর্যন্ত আপনি আপনার স্বপ্নের দিকে হাঁটা শুরু করলেন এবং সফল হলেন। খুব কৌতুহল থেকেই পরের প্রশ্ন, পেজের নাম "Vermillion" কেন?

ফেরদৌস আরা মাহফুজ: আমাদের পেজের ৬ বছর হতে চলেছে, এই ৬ বছরে আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তা আমাদের ৩ জন এর সম্মিলিত কষ্টের ফসল। আমাদের পেজ "Vermilion" ।  পেজ নিয়ে সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হয়, সেটি হল পেজের নাম।  "Vermilion" এর ০২জন প্রতিষ্ঠাতা হলেন আর্টিস্ট। তাদের কাছে রঙ খুব প্রিয়, তাই এই রঙের নাম হিসেবে "vermilion (red)" থেকে এসেছে "Vermilion" নাম। লাল এর সমার্থক হিসেবে আমরা এই নাম রেখেছি। আমার মতে,  "লাল উৎসবের রঙ , আনন্দের রঙ, সাহসের রঙ"।

আমরা একবার চেষ্টা করেছিলাম পেজের নামটা বাংলা করতে কিন্তু পেজের নাম না পাল্টানোর জন্য আমরা এতো মেসেজ পেয়েছি যে আমরা আর সাহস করেনি। ঐ চিন্তা বাদ দিয়েছি। এজন্য আমরা আমাদের ক্রেতা/সহযাত্রী দের ভালোবাসায় কৃতজ্ঞ ।

জাগরণীয়া: বর্তমানে কি কি পণ্য বিক্রি করছে "Vermilion"?

ফেরদৌস আরা মাহফুজ: আমরা মূলত শাড়ি দিয়ে শুরু করেছিলাম। তারপর করেছি গহনা, সালোয়ার কামিজ। আর এখন কাস্টমাইজড লেহেঙ্গা থেকে শুরু করে শাড়ি, কুর্তি, সালোয়ার কামিজ সবই ক্রেতার পছন্দে তৈরী করে থাকি। ক্রেতারা তাদের পছন্দের রঙ,কাপড় বা ডিজাইন সম্পর্কে জানানোর সুযোগ রয়েছে, তাদের পছন্দের সাথে মিলিয়ে আমরা পোশাক/গহনা তৈরি করি। আমরা দেশীয় পণ্যের পাশাপাশি যখন যেখানে ঘুরতে যাই দেশ ও দেশের বাহিরে সেখানকার ঐতিহ্যবাহী পণ্যে নিয়ে আসি আমাদের ক্রেতাদের জন্য।

জাগরণীয়া: পেজের মডেল হিসেবে মাঝে মাঝে আপনাকেই দেখা যায়। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন? 

ফেরদৌস আরা মাহফুজ: পেজের মডেল হিসেবে আমি কাউকে খুঁজিনি। বরং আমি নিজেই মডেল হয়েছি। আমি বলছি না যে আমি একজন মডেলের মতো লুক/পোজ দিতে পেরেছি। কিন্তু আমি ভেবেছি আমি যখন আমার নিজের প্রোডাক্ট ব্যবহার করবো শুধু তখনই একজন ক্রেতা আমার প্রোডাক্ট এর উপর বিশ্বাস তৈরী হবে। এছাড়া আমি আমার প্রাত্যাহিক জীবনেও যখন পোশাক বা গহনা পড়ি অবশ্যই আমার নিজের তৈরী প্রোডাক্ট ব্যবহার করি। বন্ধু, পরিবার বা কোন বিয়ের প্রোগ্রামে বা যেকোন উৎসবেই যখন কাউকে উপহার দেই তখন আমি আমার নিজের প্রোডাক্ট উপহার হিসেবে দিতে পছন্দ করি। কারন আমার প্রোডাক্ট আমার বিশ্বাস আর ভালোবাসা।

জাগরণীয়া: অনেকেই ভেবে থাকেন পার্টনারশিপ ব্যবসা খুবই  ঝামেলাদায়ক। সেক্ষেত্রে আপনার অভিজ্ঞতা যদি পাঠকদের জন্য শেয়ার করেন-

ফেরদৌস আরা মাহফুজ: আগেই বলেছি, আমার ব্যবসায়িক পার্টনাররা আসলে রঙ-তুলির মানুষ। অথচ আমি এই ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসিনি। কিন্তু তা নিয়ে আমাকে কখনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি তাদের জন্য। বরং পার্টনারশিপে ব্যবসা করতে এসে আমি বলবো, আমি এই ক্ষেত্রে ভাগ্যবতী। কারন আমাদের ০৩ জনের পার্টনারশিপ নিয়ে কখনও কোন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় নি। আমাদের কাজ মূলত ০৩টি আলাদা অংশে ভাগ করা। সবাই যার যার দায়িত্ব পালন করি। কেউ কাউকে উপদেশ বা অযথা বিরক্ত করি না। নিজের মতামতও চাপিয়ে দেই না। তবে দিন শেষে টিম মিটিং এ আমরা একে অন্যকে উপদেশ এবং কাজের প্রচুর  সমালোচনা করি। ভুল শুধরে দেই। একে অন্যের কাজ আর মতামতকে প্রাধান্য দেই। কারণ, আমরা নিজেরা ভুল শুধরে না দিলে পেজ কখনও উন্নতি করবেনা। যেহেতু প্রত্যেকের কাজ ভাগ করা তাই এই ০৩ অংশ এক না হলে কোন কাজই সফলভাবে সম্পূর্ণ হবে না। তাই এখানে কারো কাজের বেশি ক্রেডিট নেয়ার প্রশ্নই উঠেনা। স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা আর পারস্পরিক আস্থা থাকলে আমি মনে করি, ব্যবসার জন্য পার্টনারশিপ পদ্ধতি খুবই ভালো।  

জাগরণীয়া: উদ্যোক্তা হওয়া তো একটি চ্যালেঞ্জ। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন?

ফেরদৌস আরা মাহফুজ: সত্যিকার অর্থে ব্যবসা কোনো চ্যারিটি নয়। ব্যবসার প্রথম ও শেষ কথা হলো মুনাফা। তবে সেই মুনাফা আপনাকে অবশ্যই পণ্যের মান বজায় রেখে সততার সাথে উপার্জন করতে হবে। সবাই আমাকে বলেছে এতো পড়াশুনা করে কেন চাকরি করছিনা? কেন ঘরে বসে আছি? আমি বিশ্বাস করি একদিন তারা বুঝতে পারবে যে আমি আসলে কি করেছি আর এখন কোথায় দাঁড়িয়ে আছি। আমার প্রতিনিয়ত নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড়াতে হয়, নিজেকে প্রশ্ন করতে হয়, আমি যদি ক্রেতা হই, তবে আমি কি এই  পণ্যটি কিনবো ? আমি কি এই দামে কিনবো নাকি দাম টা বেশি?  আমার পরিশ্রম, আমার পণ্যের মান, বজায় রেখে কিভাবে আমি সাশ্রয়ে ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারি। মোট কথা আমাকে প্রতিদিনই  ভাবতে হয় , আমার এই পণ্য বা সেবা দীর্ঘ মেয়াদে মুনাফা দিতে পারবে কি না? আমার পেজের সুনাম বজায় রাখতে পারবে কিনা?

জাগরণীয়া: প্রতিদিন এত এত নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে সেখানে "Vermilion" কিভাবে টিকে থাকবে বলে আপনি মনে করেন? 

ফেরদৌস আরা মাহফুজ: আসলে টিকে থাকার জন্য ওইরকম কোন স্ট্র্যাটেজি নেই। মার্কেট বুঝে সৎ থেকে নিজের জায়গা থেকে কাজ করে যেতে হবে। আপনাকে কিন্তু কেউ কোন ধরনের তথ্য দিয়ে সাহায্য করবে না। সবকিছু আপনার একা করতে হবে। কোথায় কোন কাঁচামাল পাওয়া যায়, কোথায় সহজলভ্য, কোথায় গেলে কি পাবেন তা বছরের পর বছর কষ্ট করে আপনাকেই খুঁজে বাহিরে করতে হবে।  এত পরিশ্রমের  পর আপনি সফল হবেন, মুনাফা অর্জন করবেন, ক্রেতার কাছ থেকে প্রশংসা পাবেন তখন সেই সার্থকতাটুকু কিন্তু শুধুই আপনার। আপনার সকল কষ্ট ভুলিয়ে নতুন করে পরবর্তী কাজকে আরো দ্বিগুণ উৎসাহে এগিয়ে নিয়ে যেতে আপনাকে প্রত্যয়ী করে তুলবে এবং আপনি তখন গর্বের সাথে বলতে পারবেন এটি আমার পণ্য, আমার প্রতিষ্ঠান, আমার ব্র্যান্ড । আমার নিজের। আর এখানেই আপনার তৃপ্তি, আপনি হয়ে উঠেন অনন্য। 

জাগরণীয়া: ঘরে বসে কাজ করাকে অনেকে মূল্যায়ণ করতে চায় না। এ বিষয়টিকে নিয়ে আপনার মন্তব্য জানতে চাচ্ছি-

ফেরদৌস আরা মাহফুজ: অনেকেই মনে করেন, চাকরি ছেড়ে ঘরে বসে আছি। ঘরে বসে শাড়ি গহনা বিক্রি করা- এ আর এমন কি!  তাদের বলছি আপনারা একদম ই ভুল, আপনি ঘরে বসে পণ্য পাচ্ছেন আপনারা আরাম করছেন আর আপনাদের (ক্রেতাদের) সুবিধে করার জন্য আমরা প্রতিনিয়ত কাজ করে  যাচ্ছি। আমরা কিন্তু ঘরে বসে পন্যে তৈরী করিনা শুধু অর্ডার নেয়া যায় ঘরে বসে।  বাকিটা  কিন্তু আপনাকে মাঠে নেমে কাজ করতে হয়। সেখানে কোন অফিসরুম থাকেনা, এয়ার কন্ডিশন থাকেনা, গাড়িও থাকেনা।  আপনাকে একজন সাধারণ বিক্রেতার মতোই সব কাজ করতে হয়। কখনও কখনও সরকারি চাকরি বা প্রাইভেট ফার্মের চাকরি থেকে কয়েকগুন বেশি কষ্ট আর মানসিক চাপ থাকে। কারন দিন শেষে মুনাফা না হলে ক্ষতি শুধু আপনার একার সরকার বা অফিসের বসের না। তাই আমি বলবো, এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসুন যে অনলাইন ব্যবসা খুব সহজ। ঘরে বসেই সব করা যায়।

জাগরণীয়া: দেশে নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে আপনার মন্তব্য-

ফেরদৌস আরা মাহফুজ: আমি বিশ্বাস করি, সবাই পরিবার থেকে এভাবে সাপোর্ট পেলে বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তারা একসময় আমাদের দেশের অর্থনীতি কন্ট্রোল করবে। কারণ, আমি বিশ্বাস করি বিবাহিত মেয়েদের ক্ষেত্রে পরিবারের সাপোর্ট খুব দরকার যেহেতু আমি বা আমরা তৃতীয় বিশ্বে বসবাস করি।

জাগরণীয়া: অসংখ্য ধন্যবাদ মাহফুজ। "Vermilion" এর জন্য জাগরণীয়ার পক্ষ থেকে অনেক অনেক শুভকামনা।

ফেরদৌস আরা মাহফুজ: জাগরণীয়াকেও অসংখ্য ধন্যবাদ। 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত