ছোটগল্প: ঠাটবাট

প্রকাশ | ১৩ নভেম্বর ২০১৭, ২২:৪৪


Notice: Undefined offset: 1 in /home/jagoroniya/public_html/bangla/templates/jagoroniya-v1/print_page/content.php on line 45
আমেনা বেগম ছোটন

আজ রুবি ভাবির বাসায় পার্টি। উনাদের বাসায় প্রায় পার্টি থাকে, দিদার ভাইর বাড়ি বিক্রমপুর। আতিথেয়তা তার শখ এবং জীবনের অনুসঙ্গ। প্রায়ই পার্টি দেয় তাই। অনেক মানুষ এসেছে। অনেকেই কেউ কাউকে চেনে না।

মুনা দেশ থেকে এসেছে কয়েক মাস হয়। বলা চলে হানিমুন পিরিয়ড চলছে। নতুন সংসার, হাঁড়িকুড়ি, ইউটিউব রেসিপি এপ্লাই, আশেপাশে ঘুরাঘুরি চলছে। সম্প্রতি সে ফেসবুক একাউন্টও খুলেছে, প্রতিদিনই ছবি দেয়, রান্নার, নতুন ফ্রাইংপ্যান, শপিং ট্রলির- বিষয়বস্তুর অভাব নেই। আত্মীয় বন্ধু সবাই লাইক দেয়, বড় সুখে আছে সে।

তবে কিছুটা নিঃসঙ্গ, সে গ্রামে এক ঘর ভরা মানুষের মাঝে থেকে অভ্যস্ত। এখন গল্প করার মত লোক নেই। ফোনে আর কাহাতক গল্প করা যায়? রক্তমাংসের কারো সাথে গল্প করতে মন চায়। তার স্বামী হাসান সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করে। কাজের রুটিনের রাত দিন নাই। বাসায় থাকলে সে স্পোর্টস, টক শো নিয়ে ব্যস্ত থাকে, এটা সেটা রান্নাবাড়া করতে বলে, এত বছরের একা ব্যাচেলর জীবন শেষে একটু আরাম করতে চায়। হাসানের বয়স ৩৫, মুনার ২০। দুইজনের কথা বলার মত এমন কিছু নেই যা দুজনেই উপভোগ করবে। মুনার এ নিয়ে দুঃখ নেই। তার বান্ধবীদের একজন প্রেম করে বিয়ে করেছে, চ্যাংড়া জামাই, টাকাপয়সা নেই। সেই মেয়ে তিনটা থ্রিপিসই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরে। সাজগোজের জিনিস নাই, মুনা আসার আগে তার কিছু জিনিস বান্ধবীকে দিয়ে এসেছে। তবুও মুনার গল্পগাছার জন্য মেয়ে বন্ধু চাই, হাজব্যান্ডের সাথে মেয়েলী আলাপ চলে?

তাই সে অন্যের সাথে মিশতে চায়। তবে তার স্বামী হাসান, সতর্ক করে দিয়েছে যার তার সাথে মিশতে না। কিছু বাঙালি ভাবির চলা চলতি ভাল না, শেষে মুনা বিগড়ে যেতে পারে। না না, মুনা একেবারেই বিগড়াতে চায় না। সে সংসারের শান্তি বজায় রাখায় বিশ্বাসী।

পার্টিতে সে সবাইকে তার অনভিজ্ঞ চোখে পরিমাপ করে, কার সাথে কথা বলা যায়? পার্টিতে যারা পূর্ব পরিচিত তারা নিজেদের মধ্যে গল্প করছে, যাদের বাচ্চা ছোট তারা বাচ্চা নিয়ে ব্যস্ত। তাদের খাওয়াতে হচ্ছে, পাহারা না দিলে হয় জিনিস পত্র নষ্ট করছে অথবা বাইরে চলে যাচ্ছে। রুবি ভাবি আয়োজন তদারকি নিয়ে খুব ব্যস্ত। সে কারোর সাথে ভিড়তে পারছে না। আগ বাড়িয়ে কার সাথে কথা বলবে?

-- আপনি অন ট্রে আইটেম নিয়েছেন? - একজন স্মার্ট, পরিপাটি ভাবি জিজ্ঞেস করেন।
-- জ্বি? কি নিবো বললেন?
-- ওই যে, স্প্রিং রোল, চিপ্স নিয়েছেন?
-- জ্বি নিয়েছি।
-- আমি তানিয়া, আপনি?
-- মুনা, আমার হাজব্যান্ডের নাম হাসান।

তানিয়া হেসে ফেলে, মেয়েটা মনে হয় এদেশে নতুন। এখনো আইডেন্টিটি নিয়ে কনফিডেন্ট হতে পারে নি। তানিয়াও এমন ছিল। 

-- আপনি একা বসে আছেন, তাই আলাপ করতে এলাম।
-- জ্বি, খুব ভাল হল। আমি এখানে কাউকে চিনি না তেমন।
-- ক'বছর হল এখানে এলেন?
-- তিন মাস আগে এসেছি। আপনি?
-- এই বছর তিনেক।
-- তা তো অনেক দিন। মুনা অবাক হয়।
-- হু, আপনার তুলনায় তো অনেকই। হাসে তানিয়া।
-- ছেলেমেয়ে নেই?
-- প্ল্যান করি নি এখনো। দেখি আরেকটু গুছিয়ে নিই।

মুনা খুব অবাক হয়। তিন বছরেও বাচ্চা চায় না? বলে গুছিয়ে নিই, নাকি বাচ্চা হয় না? সমস্যা আছে?

-- ও আচ্ছা, জব করেন?
-- হ্যাঁ।
-- কিসে?
-- একটা ইউনিতে। ক্লিনিং করি।
-- ক্লিনিং? কি ক্লিন করেন? মুনা আরো অবাক।
-- ফ্লোর, টয়লেট সবই করা লাগে।

মুনার একটু গা ঘিনঘিন করে। এই মহিলা সুইপার? মেথর? ছিঃ। এর পাশে বসতেও অস্বস্তি লাগছে। তার একটু শুচিবাই আছে হোক বিদেশি সুইপার। সুইপার তো সুইপারই। অথচ পোশাক আশাক, গয়নাগাটি বেশ দামী, কে বুঝবে বাইরে থেকে! এতক্ষণ যে আন্তরিক গলায় কথা বলছিল, তাতে ভাটা পড়ে।

মুনার চেহারার পরিবর্তনটা তানিয়ার চোখ এড়ায় না। সে মনে মনে একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে। তানিয়ার হাজব্যান্ড এখনো স্টুডেন্ট, তাদের রেসিডেন্সি নেই। এ অবস্থায় জব নিয়ে খুঁতখুঁত করার অবস্থায় সে নেই। তার টাকা দরকার। তারা তিন বোন, ভাই নেই। একজনের বিয়ে হয়ে গেছে, আরেকজন এখনো পড়ছে। মা বাবা গ্রামে থাকে, বাবা রিটায়ার্ড স্কুল মাস্টার। সে এখান থেকে সাহায্য না করলে তারা চলতে পারবে না। তার হাজব্যান্ড আতিকের ওয়ার্কিং আওয়ার পারমিট সপ্তাহে মাত্র ২০ ঘন্টা, ম্যাক্সিমাম ইনকাম তানিয়াই করে। খেতে পরতে চলতে খরচ প্রচুর। শৌখিন গৃহবধূ হবার মত অবস্থা তার নেই। আর এ অবস্থায় বাচ্চা নেবার মত বিবেচনাহীন কাজও সম্ভব না। বাইরের লোকে এসব কিছুই বুঝে না।

-- ভাইয়া কি করে, ভাবি?
-- ও স্টুডেন্ট। পার্টটাইম কাজ করে এইজেড কেয়ারে।
-- এইজেড কেয়ার কি?
-- ওল্ড হোম। সংক্ষেপে বলে তানিয়া।
-- সেখানে কি করতে হয়?
-- সব, গোছল, খাওয়ানো, বাথরুম করানো, সব। তানিয়া রাখঢাক করার চেষ্টা করে না। সে তার পেশা বা স্বামীর অবস্থা নিয়ে লজ্জিত না, কেন রাখঢাক করবে?

মুনা আরো গম্ভীর হয়ে যায়। হাজব্যান্ড ওয়াইফ দুইজনেই খবিশ। দেশে আর কাজ নাই? একজন সুইপার আরেকজন আয়াবুয়ার কাজ করে, ছিঃ।

এমন সময় রুবিভাবি ডিনার খেতে ডাকে। মুনা হাঁফ ছাড়ে। তাড়াতাড়ি ডিনার নিতে চলে যায়, এই সুইপার মহিলার ছোঁয়াছুঁয়ি এড়াতে চায় সে। তানিয়া মুচকি হাসে। তার কাজের প্রথম দিনের কথা মনে পড়ে, ক্লিনিং মব হাতে নিয়ে এমন কান্না পেয়েছিল। আজও মন টা খারাপ হচ্ছে। জানে সে বেকার থাকার চেয়ে শ্রমের গুরুত্ব অনেক বেশি। তবু কারো অসম্মানের দৃষ্টি বড় কষ্ট দেয়।

-- কি, নতুন গাড়ি কিনছেন বলে?
রুবির ডাকে বাস্তবে ফিরে তানিয়া। -- জ্বি ভাবি, এই আর কি?
-- ব্রান্ড নিউ?
-- না, ২০১২ এর। ভোক্স ওয়াগন।
-- প্রায় নতুনই তো। আমি তো লাইসেন্সই নিতে পারলাম না। গাড়ি তো স্বপ্নই।
-- নিয়ে নেন, অনেক ভাল ইন্সট্রাকটর আছে এখন।
-- তোমার ভাই ব্যাটা ইন্সট্রাকটর পছন্দ করে না।
-- মহিলাও আছে। রকডেলের আঞ্জুমান ভাবি, বেশ ভাল শেখায় শুনেছি।
-- আচ্ছা, নম্বরটা দিয়েন। এখন ডিনার করেন, আসেন। ডেজার্টে আজকে তিন পদের মিষ্টি করেছি। খাইয়েন মনে করে, আপ্নে তো আবার ডায়েট কন্ট্রোল করেন।
-- আরে না, দাওয়াতে আবার কিসের ডায়েট?

খাওয়া গল্প পার্টি শেষে যে যার বাড়ি চলে যায়।

৫ বছর পর

তানিয়া এখন একটা অফিসের পার্টটাইম রিসেপশনিস্ট। ব্যাংকিং কোর্সে এডমিশন নিয়েছে। বাচ্চার বয়স ২। সিটিজেনশিপ হয়ে গেছে। ওলাইক্রিকে একটা এপার্টমেন্ট কিনেছে তারা। আতিক এখন নভোটেল হোটেলে এসিস্ট্যান্ট হেড শেফ। সব গুছিয়ে নিয়েছে তারা। সামনের বছর নিউজিল্যান্ড বেড়াতে যাবে। এমনিতে বছরে ৩-৪ বার এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি হয়। ভাল আছে তারা। তানিয়ার ছোটবোনও এখানে এখন। দুই বোনের ইনকামে গ্রামে একটা ভাল বাড়ি আর বাজারে দুইটা দোকান আছে। তার বাবা মা ভালই আছে।

মুনার বাচ্চা দুইটি। সংসারের খরচও বেড়েছে অনেক। হাসানের বয়স ৪০। কাজকর্ম সেরকম করতে পারে না। মুনা কাজ করতে চায়, কিন্তু প্রায় অসম্ভব মনে হয়। ঘরের সমস্ত কাজ সামলে আর বাইরে কিভাবে কাজ করবে? কি কাজই বা করবে? ভাল ইংরেজিও জানে না। তাছাড়া এখন নাকি কোর্স ছাড়া কাজও পাওয়া যায় না। ভরসা যে সেন্টারলিংক থেকে ২ বাচ্চা বাবদ মাসে হাজার ডলার। সেটা সংসারেই লেগে যায়। গত বছর তার বাবা মারা গেছে। স্ট্রোক করে আইসিইউতে ছিল ১৫ দিন। অত খরচ বাসায় আর যোগানো যায় নি, হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে এনেছিল সবাই। এর দুইমাস পর বাসাতেই মারা যায়, তার খুব ইচ্ছে ছিল বাবার জন্য কিছু চিকিৎসা খরচ দেয়, কিন্তু হাসানের হাত একেবারেই খালি ছিল। অনেক কেঁদেছিল সে, দেশে যেতে চেয়েছিল বাবাকে দেখতে। টিকেটের দাম যোগাতে পারে নি।

মাঝেমধ্যেই তানিয়ার কথা মনে হয় তার। সুইপার হোক আর যাই হোক, তার নিজের ইনকাম ছিল। সে হয়ত প্রয়োজনে নিজের পরিবারকে সাহায্য করতে পারে, দেশে যাবার টিকেটের জন্য স্বামীর মুখাপেক্ষী হতে হয় না। বাচ্চাকাচ্চা বড় হলে, সে ঠিক একটা জব করবে। এটা তার একটা স্বপ্ন।

যদিও সেটা আসলে বাস্তব হয় না। অভ্যাস, অভ্যস্ততা এসব ছেড়ে বের হওয়াটা শুনতে যত সহজ, করতে ততটাই কঠিন। জীবন একটা ওয়ান ওয়ে জার্নি, পাল্টাতে স্রোতের বিপরীতে সাঁতরাতে হয়।