উনিশ শতকে বাংলায় নারী পুরুষ সম্পর্ক (দ্বিতীয় অধ্যায়: বিবাহপূর্ব প্রণয় সম্পর্ক)

প্রকাশ | ১৭ জুন ২০১৭, ২১:১৪

উনিশ শতকে বাংলায় নারী পুরুষ সম্পর্ক, বিলকিস রহমান রচিত প্রথম গ্রন্থ, তার গবেষণার আলোকে লেখা। 

পড়ে শেষ করলাম বইটি, পড়তে যেয়ে একটু বেশি সময় নিয়েছি, নিতে হয়েছে। আমাকে ভাবিয়েছে বইটি, তথ্য উপাত্ত অবাক করেছে, কখনও কষ্ট পেয়েছি, গুমরে কান্না নিয়ে কাটিয়েছি অনেকটা সময়। নিজের অজান্তেই করুণাও হয়েছে এই সময়ের কিছু নারী জীবন দেখে। সেই বৈরী সময়ের কতোটা পাড়ি দিয়ে এসেছি আমরা যদি তা উপলব্ধি করতো তাহলে স্বেচ্ছায় কেউ কেউ যেমন জীবনধারা বেঁছে নিয়েছে তা ভাবাতো, নিশ্চয়ই ভাবাতো!!! 

এবং বলে নিতে চাই, আমি নিতান্তই একজন সামান্য পাঠক হিসেবে এটি পড়তে যেয়ে যা আমাকে ভাবিয়েছে এবং মনে হয়েছে আরো আলোচনার দাবী রাখে সেই হিসেবেই পুরো বইটি’র একটা চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার পতনের পর নারীর স্বাধীন প্রণয়, জীবনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার এবং যৌনস্বাধীনতা একরকম বিলুপ্ত হয়। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে যে বিবাহপ্রথা প্রবর্তিত হয়, তাতে নারীর যাবতীয় মনোদৈহিক বৃত্তির উপর আরোপিত হয় কঠোর বাধা নিষেধ। 

এই প্রসঙ্গে অনেক লেখক শাস্ত্রকারদের মতামতই এসেছে এই অধ্যায়ে, তবে হুমায়ুন আজাদের যে কথা এনেছেন লেখক, সংক্ষিপ্ত আকারে বলি, পুরুষতন্ত্র প্রেমের জয়গান গায়, তবে প্রেমে বিশ্বাস করে না; আর কামের নিন্দা করে, তবে বিশ্বাস করে কামে। পুরুষতন্ত্রের প্রধান বিশ্বাসগুলোর অন্যতমটি সম্ভবত কাম; তার বিধানগুলোতে কামকে যেটুকু নিন্দা করা হয়েছে, তা পুরুষের অংশগ্রহণের জন্যে নয়, নারীর অংশগ্রহণের জন্যে। 


বাঙালি রোমান্টিক কাব্যে নরনারীর বিবাহে যে প্রণয়কথা বলা হয়েছে তাতে প্রায়শ স্বপ্নে বা চিত্রে নায়িকার রূপ দেখে অথবা লোকমুখে রূপের বর্ণনা শুনে নায়কের হৃদয়ে প্রণয়ের উন্মেষ হয়, অবশ্য কখনো কখনো আকস্মিক সাক্ষাৎ থেকেও প্রেমের সূচনা হয়। 

উনিশ শতকের বটতলায় ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দর আর দাশরথী রায়ের পাঁচালি বহুল সমাদৃত ছিল। ধর্ম ও পারিপার্শ্বিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিবাহপূর্ব শারীরিক সম্পর্কের বিষয়টি এরা তুলে এনেছেন সযতনে। 


লেখক সেই সময়ের নানান সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে এই বিষয়ে একটা ধারণা তুলে দিয়েছেন। নাটকে বিয়ের আগে পাত্রপাত্রীর প্রেম এবং পছন্দ করার অধিকারের প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছে সেটিও নিয়ে বলেছেন। বিশেষ করে নিয়ে এসেছেন বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্যের নারী চরিত্রের যে রূপ উঠে এসেছে বলা হচ্ছে তার উপন্যাসই প্রেমের মহিমাব্যাখানে বাঙালি পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।  

তবে এও সত্য যে, তৎকালীন সমাজে রোমান্টিক প্রণয় বা বিবাহপূর্ব ভালোবাসা কম ছিল, অবশ্যই মূল কারণ বাল্যবিবাহ। 

রক্ষণশীল হিন্দুসমাজে নারীপুরুষ সম্পর্ককে ধর্ম ও বিবাহের গন্ডির মধ্যে দেখা হতো। 

কাছাকাছি সময়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীর অন্যরকম শক্তিশালীরূপও উঠে এসেছে। এসব সাহিত্য প্রথাগত নারীর ধারণা পাল্টে দেয়। এখানে আমরা নারীকে দুর্বার ও ভয়ংকররূপে দেখতে পাই, যা একই সঙ্গে করুণা ও ভীতির সঞ্চার করে। 

বাল্যপ্রণয়ের বিষয়টিও সাহিত্যে বাদ যায়নি। লেখক এই বিষয়টি নিয়ে এসেছেন ভীষণ মনকারা সব লেখা তুলে এনে. প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শরৎচন্দ্র সাহিত্যের উল্লেখগুলো আমাদের নূতন করে মনকে আচ্ছন্ন করে এই লেখকের রোমান্টিক প্রেম বিষয়ক নারী-পুরুষ সম্পর্কের হৃদয়বৃত্তিক অনুভব জেনে। শেষের কবিতা এবং শ্রীকান্ত রচনা এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ যোগ্য। 

লেখক বলছেন, বাঙালির জীবনে রোমান্টিক প্রেমের চিন্তা ইউরোপীয় চিন্তাধারা থেকে এসেছে। তবে উনিশ শতকে এই চিন্তা বহমান নদীর রূপ পায়, বিবাহিত জীবনে 'রোমান্টিক' প্রেম নিয়ে আসে স্বপ্নীল বার্তা। 


বিবাহপূর্ব প্রেম পুরোনো বাংলা সাহিত্যে যেভাবে চিত্রিত হয়েছে, আধুনিক সাহিত্যে সেভাবে হয়নি। লেখক বলছেন ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় পর্বে ইউরোপীয় ও হিন্দু এই দুই ধারার সমন্বয়ে নরনারীর সম্পর্কের যে নূতন ধারণা তার প্রকাশ সমস্ত বাংলা সাহিত্য জুড়িয়া আছে এবং সেই ধারণা প্রভাবিত করে ব্যক্তিগত জীবনকে। 

ধূর্জটিপ্রসাদের মতে, 'উনিশ শতকের বাংলায় প্রেম নামক পদ্ধতিটি আবিষ্কার করলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্যোপাধ্যায়। এরপর এলেন রবিবাবু। তিনিই আমাদের সকলকে প্রেমে পড়তে শিখিয়েছেন। তাঁরই ভাষা দিয়ে আমরা প্রেম করি। তাঁরই ভাব দিয়ে আমরা প্রেমে পড়ি। 

উনিশ শতকের প্রেম, বিবাহ, বিবাহোত্তর প্রেম বা বিবাহবহির্ভূত প্রণয় সম্পর্কের পাশাপাশি বিধবা বিবাহের পক্ষে বিপক্ষে প্রচুর লেখালিখি শুরু হয়। 

লেখক এটিও উল্লেখ করেছেন যে দেশে স্ত্রী -পুরুষের মেলামেশার ধারাটা বহু শতক ধরে একেবারেই নেই সেখানে তা সহজে বা দ্রুত প্রণয় সম্পর্ক গড়ে উঠবে না তা বলাইবাহুল্য। 

উনিশ শতকে ব্রাহ্ম সমাজই বাঙালি নারী সম্বন্ধে নূতন শ্রদ্ধা জাগ্ৰত করেছিল। বঙ্কিমচন্দ্র প্রাচীন ও প্রথাগত বাঙালি সমাজে স্ত্রীজাতি সম্পর্কে যে অবজ্ঞা ও অশ্রদ্ধা ছিল তার কঠিন সমালোচনা করতে দ্বিধা করেননি। 


লেখক আলোচনা টেনেছেন এখানে পাশ্চাত্যের ইংরেজী শিক্ষা ও সাহিত্য শিক্ষিত তরুণ সমাজে প্রভাব বিস্তার করেছিল তা নিয়ে। 

উনিশ শতকের শুরুতে ইংরেজীশিক্ষিত যুবকরা কোনোভাবেই মানতে চায়নি সমাজের সেকেলে ধরাবাঁধা নিয়ম-কানুন। সমাজ সংস্কার ও স্ত্রীশিক্ষাসহ অনেক কাজে যোগ দিয়েছিলেন দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়। রোমান্টিক প্রেমকে গুরুত্ব দিয়েছেন নিজের জীবনে। গভীর প্রণয়ের পর বিয়ে করেছিলেন রূপসী বিধবা বসন্তকুমারীকে। 

শুধু তিনিই নয়, আরো অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিই ব্যক্তিজীবনে রোমান্টিক প্রেমকে গুরত্ব দিয়েছেন, খুঁজেছেন জীবনের স্বার্থকতা। এখানে লেখক রবীন্দ্রনাথ সহ বিখ্যাত অনেকের জীবনের এইসব অভিজ্ঞতারই টুকরো চিত্র তুলে ধরেছেন। 

উনিশ শতকের শেষ দিকে হিন্দুসমাজে রক্তের সম্পর্কীয় কারো সঙ্গে বিবাহ তো দূরের কথা, প্রণয় সম্পর্কও গড়ে উঠা নিষিদ্ধ ছিল। প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ অতুল প্রসাদ মামাতো বোনকে বিয়ে করার জন্য দেশ ত্যাগ করেছিলেন। 

সেই সময় অন্য অঞ্চল ও অন্য ধর্মের লোকদের সঙ্গে বিবাহ সম্পর্ক স্থাপনে বাঙালিদের মধ্যে প্রবল বাধা ছিল। বাঙালি নারীদের মধ্যে সবার আগে যিনি এক বিদেশীকে বিয়ে করেন, তিনি সম্ভবত হরিপ্রভা তাকেদা। 

অভিজাত মুসলিম পরিবারে পর্দাপ্রথার কঠোরতার জন্য নিকট আত্মীয় ছাড়া মুসলিম নারীর পক্ষে কথা বলা বা মেলামেশা করার সুযোগ ছিল না। তাই নারীপুরুষের বিবাহপূর্ব প্রেম সহজে হতে পারতো না। তবে আত্মীয়ের মধ্যে প্রেম করেই হোক বা অন্য ভাবেই হোক বিয়ে খুব বেশি হতো। 

মুসলমান সমাজে কঠোর পর্দাপ্রথা বিরাজমান থাকায় বিয়ের আগে পাত্রপাত্রীর পরিচয়ের সুযোগ কম ছিল. বেগম রোকেয়ার অবরোধবাসিনীতে কাজী সাহেবের তিন মেয়ের একই দিনে বিয়েতে কন্যা উল্টা-পাল্টা হয়েছিল। 

লেখকের তুলে আনা প্রতিটি মতামতই আমাদের মনোজগতে ছাপ রেখে যায়, তবে এই অধ্যায়ের যে তথ্যটি না বললেই নয় উনিশ শতকে ভূদেব মুখোপাধ্যায় বা বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে হিন্দু পুরুষের সঙ্গে মুসলিম নারীর প্রণয়ের চিত্র মুসলমানদের ক্ষুব্ধ করেছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় 'মুসলমান লেখকরা একবারে ঐতিহাসিক ঘটনার আশ্রয়ে এমন উপন্যাস রচনা করতে প্রবৃত্ত হলেন, যেখানে হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্ব থাকবে, মুসলমানদের বীরত্ব প্রকাশ পাবে এবং হিন্দু নারী মুসলমান যুবকের প্রণয়ে নিমজ্জিত হয়ে ধর্মান্তর গ্রহণ করবে'। 

(চলবে...)